দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা রাখার পর ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর শেয়ারদর এখন পতনের ধারায়। ফলে মার্কিন পুঁজিবাজারের শেয়ার সূচকই এখন নিম্নমুখী। এখন এশিয়ার পুঁজিবাজারেও দেখা যাচ্ছে ওয়াল স্ট্রিটের এ ধারার পুনরাবৃত্তি। গতকাল এখানকার বেশির ভাগ শেয়ার সূচক ছিল নিম্নমুখী।
বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। এফওএমসির ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার অন্তত ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।
তবে এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতি জাপানের শেয়ারবাজারে গতকাল ফেডের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার পাশাপাশি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজে করেছে দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বেশ সতর্ক অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ সময় গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জাপানি পুঁজিবাজারের প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫-এর পতন হয়েছে প্রায় ১ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবাকে নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্যমতে, একাধিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রতি জনসমর্থন কমেছে। এর ফলে শিগেরু ইশিবার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা না-থাকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি উঠছে। তবে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করে তুলেছে শিগেরুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিরোশি মোরিয়ামার এলডিপির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা।
এ বিষয়ে এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার স্টিফেন ইন্নেস বলেন, ‘এ রাজনৈতিক অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ। প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার দলের ক্ষমতাধর শীর্ষ ব্যক্তি পদত্যাগের ইঙ্গিত দেয়ায় ক্ষমতাসীনদের ভিত্তি নড়ে গেছে।’
জাপানের মতো সামগ্রিকভাবে গতকাল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অধিকাংশ সূচকই ছিল নিম্নমুখী। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার এসএন্ডপি/এএসএক্স২০০ সূচক কমেছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক দশকি ২ শতাংশ বাড়লেও হংকংয়ের হ্যাং সেং ও সাংহাই কম্পোজিট সূচক যথাক্রমে দশমিক ৬ ও দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারেও এখন নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গতকাল এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ওয়াল স্ট্রিটে আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হয়নি। এর আগে মঙ্গলবার ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক সংকুচিত হয়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। এক মাসের মধ্যে এদিনই সবচেয়ে বড় পতনের দেখা পেয়েছে মার্কিন শেয়ারবাজার। মঙ্গলবার দিনের শুরুতেই ওয়াল স্ট্রিটে সূচকটির পতন ঘটে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও পরে বাজার কিছুটা সংশোধন হয়ে এ পতনের হার কমে আসে।
এদিন ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ও নাসডাক কম্পোজিট সূচক কমেছে যথাক্রমে দশমিক ৫ ও দশমিক ৮ শতাংশ। সূচক তিনটির সর্বশেষ লেনদেন নিম্নমুখী হলেও তাদের সামগ্রিক প্রবণতা এখনো বেশ শক্তিশালী। সূচকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। বর্তমানে এগুলো ওই পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে পতনের কারণেই নিম্নমুখী হয়ে উঠেছে মার্কিন পুঁজিবাজার। এসব কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে মার্কিন অর্থনীতিতে আধিপত্য ধরে রেখেছে। এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর ভ্যালুয়েশন এ পর্যায়ে বেড়েছে যে এগুলোর শেয়ারদর এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ লেনদেনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে অপরিহার্য চিপ নির্মাতা কোম্পানি এনভিডিয়ার শেয়ারদর কমেছে ২ শতাংশ। এই একটি কোম্পানির শেয়ারদরে পতনই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে নিম্নমুখী করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে একই দিনে অ্যামাজন ও অ্যাপলের শেয়ারদর কমেছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৬ ও ১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন শেয়ারবাজারে ক্রমেই চাপ বাড়াচ্ছে মার্কিন বন্ড বাজারের ক্রমবর্ধমান ইল্ড। বর্তমানে দেশটিতে ১০ বছরের ট্রেজারি ইল্ড শুক্রবারের ৪ দশমিক ২৩ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। সাধারণত বন্ড থেকে বেশি সুদ পাওয়া গেলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের জন্য উচ্চমূল্য পরিশোধে কম আগ্রহী হন, যার প্রভাব পড়ে বাজারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ড বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো বিশ্বের দেশে দেশে সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি ইল্ডের ওপর এখন বেশি চাপ দেখা যাচ্ছে। সুদহার না কমানোয় ফেডারেল রিজার্ভকে চাপে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আবার এ থেকেও তৈরি হচ্ছে আরেক আশঙ্কা।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবের কারণে ফেড যদি স্বাধীনতা হারায়, তবে সংস্থাটির মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় অথচ কঠিন পদক্ষেপ নেয়ার সক্ষমতাও কমে যাবে।
এক ফেডারেল আপিল আদালত শুক্রবার জানিয়েছেন, প্রায় প্রতিটি দেশের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করতে গিয়ে আইনি ক্ষমতার লঙ্ঘন করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এখনো শুল্কগুলো বহাল রয়েছে। ওই রায়ের পর মঙ্গলবার ছিল মার্কিন পুঁজিবাজারে প্রথম লেনদেনের দিন।
বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং এটি মার্কিন শ্রমবাজারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আদালতের আদেশ উল্লেখ করে ওয়েলস ফারগো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গ্লোবাল মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট স্কট রেন বলেন, ‘শুল্ক থেকে আয় কমে গেলে মার্কিন সরকারকে তার বিল পরিশোধের জন্য আরো বেশি ঋণ নিতে হতে পারে।’
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত মাসে মার্কিন উৎপাদন খাত অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সংকুচিত হয়েছে। এরপর দিনের শুরুতে ট্রেজারি ইল্ড বাড়লেও পরে কমে আসে। এদিন মার্কিন অনেক কোম্পানি ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টকে জানিয়েছে, শুল্কের কারণে দেশটির উৎপাদন খাতের পরিস্থিতি এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে।